বামুন পণ্ডিত

বহুদিনের কথা। তখন আধুনিক স্কুল-কলেজ এখনকার মতো এতটা বেশুমার হয়নি। সংস্কৃত পড়ার জন্য টোল আর ফারসি পড়ার জন্য মাদ্রাসা—এই-ই ছিল। স্কুল-কলেজ খুঁজে পাওয়া সে সময় অত সহজ ছিল না।

সংস্কৃত পড়ার টোলের পণ্ডিত এবং ফারসি পড়ার মাদ্রাসার মৌলভিদের ধর্ম-কর্মের অনুষ্ঠানে নিমন্ত্রণ করে খাওয়াতেন মানুষেরা। হিন্দুরা নেমন্তন্ন করে খাওয়াতেন সংস্কৃত পণ্ডিত বা বামুন-পুরুতকে। বলা ভালো, তাঁরা খেতেও পারতেন মেলা। খাওয়ার শেষ দিকটায় হতো প্রতিযোগিতা। যেমন পুরুত মশাইয়ের গলা পর্যন্ত খাবার উঠে গেছেÑএমন অবস্থায় নিমন্ত্রণকর্তা হয়তো বললেন, পুরুত মশাই আরেকটা রসগোল্লা খেতে পারলে আপনাকে আরও এক টাকা বেশি দেব। টাকার লোভে তিনি খেতেন। কোনো কোনো ক্ষেত্রে এমন হতো যে পুরুত-বামুন আর হেঁটে বাড়ি ফিরতে পারতেন না। বাঁশের তৈরি সাইংয়ে করে তাঁকে বাড়ি পৌঁছে দিতে হতো। মৌলভি-মাওলানাদের মধ্যেও কেউ কেউ ছিলেন এমন পরখেকো খাদক।

তো, একবার এক শিক্ষিতা ও সুচতুরা হিন্দু বিধবা ভাবলেন, বামুন-পুরুতেরা খাবার নিয়ে বড় অরুচিকর বাড়াবাড়ি করেন। তাই তাঁদের নেমন্তন্ন না করে সংস্কৃত টোলের দুজন পণ্ডিতকে নেমন্তন্ন করবেন। দুজন বিদ্বান খাবেন, দুটো জ্ঞানের কথা বলবেন, সে ভারি শোভন হবে।

যেমন ভাবা তেমন কাজ।

দুই পণ্ডিতকে নেমন্তন্ন করে বাড়িতে আনলেন তিনি। সমাদর করে বসালেন। অনুরোধ করলেন হাতমুখ ধুয়ে আহারে বসতে। জলের ঘটি নিয়ে বাইরে গেলেন এক পণ্ডিত। সে সময় যিনি ঘরে ছিলেন, তিনি আরেক পণ্ডিত। বিধবাকে তিনি বললেন, ‘মা ঠাকরান, পণ্ডিতজনকে নেমন্তন করে খাওয়ানো পুণ্যের কাজ! কিন্তু আপনি ওই ছাগলটাকে নেমন্তন করেছেন কেন?’

ইতিমধ্যে হাতমুখ ধুয়ে ঘরে ঢুকেছেন বাইরে থাকা পণ্ডিত। আর ঘরের পণ্ডিত বাইরে গেছেন হাতমুখ ধুতে। সদ্য হাতমুখ ধুয়ে আসা পণ্ডিত তখন ভদ্রমহিলাকে বললেন, ‘মা জননী, আপনার মঙ্গল হোক। আপনার স্বর্গীয় স্বামীর কল্যাণ হোক। তা, আমাকে নেমন্তন্ন করায় আপনার উদ্দেশ্যকে আমি সাধুবাদ দিই। তবে ওই গাধাটাকে কেন নেমন্তন্ন করেছেন, মা ঠাকরান?’

বিধবা ভদ্রমহিলা এবার ভেতরের ঘরে গেলেন। যাওয়ার আগে তাঁদের বলে গেলেন, ‘আপনারা বসুন। আপনাদের খাবার নতুন করে সাজিয়ে আনতে আমার সামান্য একটু বিলম্ব হবে।’ কিছুক্ষণ পর দুটো বড় কাঠের খঞ্চার একটিতে তাজা ঘাস ও অন্যটিতে খড়বিচালি সাজিয়ে দুই পণ্ডিতের সামনে উপস্থিত হলেন বিধবা। বললেন, ‘খান।’

এ ঘটনায় আঁতকে উঠলেন পণ্ডিতদ্বয়, ‘একি! আমাদের এভাবে অপমান করার মানে কী?’

বিধবা বললেন, ‘আমার ওপর ক্রুদ্ধ হবেন না। আপনারাই বলেছেন, আপনাদের একজন ছাগল, আরেকজন গাধা। আমি সেইমতো খাবার দিয়েছি। আমার অপরাধ কোথায়, বলুন?’

Previous Post Next Post

Content Top Ad

Content Bottom Ad

Contact Form